রবিবার ০৩, মে ২০২৬

রবিবার ০৩, মে ২০২৬ -- : -- --

এক মণ ধান বিক্রি করেও উঠছে না একজন শ্রমিকের মজুরি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ মে ২০২৬, ১১:১৪ পিএম

10

রাজশাহীর তানোরে চলতি বোরো মৌসুমে এক মণ ধান বিক্রি করে উঠছে না একজন শ্রমিকের মজুরি। এতে বোরো চাষিরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। বহিরাগত শ্রমিক না আসা এবং ধান মাটিতে নুয়ে পড়ার কারণে শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে। ফলে মজুরিও বেড়েছে।

কৃষকরা জানান, বর্তমানে বাজারে নতুন এক মণ (২৮ কেজিতে মন) ধান বিক্রি হচ্ছে ৮৩০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে। ৪০ কেজিতে মন বিক্রি হচ্ছে ১১০০ টাকা থেকে ১১২০ টাকা। আর শ্রমিকের মূল্যে আধা বেলায় সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ৬০০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকা এবং বিকাল ৪ পর্যন্ত কাজ করলে ১১০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা। 

জ্বালানি সংকটের কারণে মোকাম থেকে পরিবহন না আসায় ধানের দাম কমেছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীসহ কৃষকরা। হাট বা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ধান বিক্রি না করে সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থার দাবি তুলেছেন কৃষকেরা। তাদের মতে, এভাবে বিক্রি করলে কিছুটা হলেও ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারে।

চাষিরা জানান, নানা জটিলতা ও হয়রানির কাড়নে গুদামে ধান বিক্রিতে আগ্রহ নেই কৃষকদের।  অনেক কৃষক আছেন যারা সুদ ও ঘুষের সঙ্গে জড়িত থাকতে চান না আর গুদামে ঘুষ দিতেই হবে এমন কারণে গুদামে ধান দেন না কৃষকরা। চলতি মৌসুমে আলু চাষে ব্যাপক লোকসানের পর ধানেও ক্ষতির মুখে পড়ায় অনেক কৃষক চরম সংকটে পড়েছেন। 

এলাকাবাসী ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তানোর উপজেলার বিলকুমারী বিলে আগাম বোরো ধান চাষ হয়। এছাড়া আলু উত্তোলনের পর মার্চ মাসের শুরু থেকে আরেক দফা বোরো চাষ শুরু হয়। চান্দুড়িয়া ইউপির চান্দুড়িয়া ব্রিজ ঘাট থেকে তানোর পৌরসভা হয়ে কামারগাঁ ইউপির মালশিরা চৌবাড়িয়া ব্রিজ ঘাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ বিলের জমিতে আগাম বোরো ধান চাষ করা হয়। বর্তমানে এসব জমির ধান কাটা চলছে। বিঘা প্রতি গড়ে ২৫ থেকে ৩০ মণ পর্যন্ত ফলন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা। তবে অনেক ক্ষেত্রেই আধাপাকা ধান কাটা হওয়ায় ফলন কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে। এবছর বোরো ধান চাষ করে কৃষকরা বিঘা প্রতি ৩ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।

তোফা নামের এক কৃষক বলেন, তিনি সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। পুরো জমির ধান কেটে বাড়িতে আনা হয়েছে। বর্তমানে ধান মাড়াই করে বিক্রি করছেন তিনি। বাজারে দাম কম থাকায় ৮৫০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া মাড়াইয়ের জন্য আগের তুলনায় বেশি ধান দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের। আগে যেখানে ১৫ কেজি ধান দিতে হতো, এখন ২০ কেজি পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। 

ফারুক নামের আরেক কৃষক জানান, ২৪ কাঠা জমির ধান কাটা হয়েছে। ৮ জন শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে হয়েছে, যেখানে জনপ্রতি দিনে ১২০০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, এখন শ্রমিক সংকট এবং অতিরিক্ত মজুরির কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। 

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, বহিরাগত শ্রমিক না আসায় ধান কাটতে দেরি হচ্ছে এবং স্থানীয় শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তারা চুক্তিভিত্তিক কাজ না করে দৈনিক মজুরিতে কাজ করছেন। ফলে ধান কাটা খরচ আরও বেড়ে গেছে। 

কৃষক শাকির জানান, তিনি তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন। বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে বিঘায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক কৃষকই কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেন। কৃষকেরা আরও জানান, ধানের দাম কম, কিন্তু চালের দাম বেশি। এ পরিস্থিতিতে প্রান্তিক কৃষকেরা চরম সংকটে পড়েছেন। তারা সরকারি হাটে সরাসরি ধান ক্রয় বা নির্ধারিত দামে সংগ্রহ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।

তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০ হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো বিলের ধান কাটা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Link copied!