বৃহস্পতিবার ২১, মে ২০২৬

বৃহস্পতিবার ২১, মে ২০২৬ -- : -- --

১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা: গ্রেপ্তারের দেড় যুগ পরও বেঁচে আছেন সেই রসু খাঁ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ মে ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

18

রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় একদিকে শোকে স্তব্ধ সারাদেশ, অন্যদিকে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন আর কত নারী ও শিশুকে এমন নির্মমতার শিকার হতে হবে? সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে ধর্ষণে অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার না করা নিয়ে। বিশেষ করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানে দেরি, রায় দেয়া পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রিতা এবং পরবর্তীতে আপিল, আপিলের রায় প্রদান ও সাজা কার্যকরে আরও কয়েক দফা সময়ক্ষেপণ। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ দেশের সাধারণ মানুষ।

এর আগে গেল বছর বহুল আলোচিত আছিয়া হত্যার ঘটনারও সাজা কার্যকর হয়নি এখনও। ৮ বছর বয়সী আছিয়া, রামিসার মতো একই ধরনের নির্মমতার শিকার হয়। ধর্ষণের শিকার হওয়ার ৮ দিন পর মারা যায় শিশুটি। পরে অভিযুক্ত তার বোনের শশুর হিটু শেখের ফাঁসির রায় হলেও আপিলে এখনও ঝুলে আছে মামলাটি।

তবে, সব থেকে পরিতাপের বিষয় হলো দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ধর্ষক এবং দেশের ইতিহাসের অন্যতম সিরিয়াল কিলার দেড় যুগ আগে গ্রেপ্তার হলেও এখনও বেঁচে আছেন। একে একে ১১ জন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটালেও ১৮ বছরেও তার বিচার শেষ হয়নি। সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান ওরফে রসু খাঁ এখন আছেন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে।

গ্রেপ্তার ও বিচার

চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের ছিঁচকে চোর ছিলেন রসু খাঁ। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর ওই গ্রামে মসজিদে ফ্যান চুরির মামলায় টঙ্গি থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর এক এক করে তার লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কথা বেরিয়ে আসে। রসু খাঁ নিজের মুখে স্বীকার করেন ১১ নারী হত্যার কথা।

তার বিরুদ্ধে মোট ১০টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯টি হত্যা মামলা এবং অপর মামলাটি হয়েছিল নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে। তার শিকার হওয়া নারীদের বেশিরভাগেরই সঠিক পরিচয় না পাওয়ায় অনেক মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল।

২০০৯ সালে পারভীন নামের এক পোশাকশ্রমিককে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় ২০১৮ সালের ৬ মার্চ চাঁদপুরের আদালত রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। পরে রায়ের বিরুদ্ধে রসু খাঁ আপিল করলে দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্ট রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। কিন্তু তার মৃত্যুদণ্ড এখনও কার্যকর করা হয়নি। অন্যান্য মামলার অগ্রগতিও তেমন নেয়।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালের ২০ জুলাই দিবাগত রাত সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সময়ে রসু খাঁসহ তিন আসামি ফরিদগঞ্জ থানার হাসা খালের দক্ষিণ পাশে পোশাকশ্রমিক পারভীনকে ধর্ষণ করেন এবং পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পরদিন ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

হত্যার শুরু যেভাবে

ফ্যান চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার বিষয়টি জানান রসু খাঁ। প্রেমে ব্যর্থ হয়েই এমন ক্রমিক সিরিয়াল কিলারে পরিণত হন বলে জানান তিনি। সবাইকে হত্যা করেন প্রেমের অভিনয় করে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে। তিনি পুলিশকে এও জানান যে, তার লক্ষ্য ছিল ১০১টি হত্যাকাণ্ড ঘটানো।

রসু খাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, টঙ্গীতে এক নারী পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে প্রেম করতে গিয়ে ধরা পড়ে গণপিটুনির শিকার হওয়ার পর তিনি শপথ নিয়েছিলেন, ১০১ নারীকে হত্যা করে তারপর মাজারে গিয়ে তওবা করে ভালো হয়ে যাবেন। কিন্তু তার আগেই মসজিদের ফ্যান চুরির ঘটনায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান।

রসু খাঁ ২০০৭ সালের প্রথম দিকে তার শ্যালক মান্নানের স্ত্রী রীনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। তার বক্তব্যানুযায়ী, শ্যালকের প্ররোচনায় তিনি হত্যা করেন রীনাকে। রীনার বাড়ি হাতিয়ায়। রসু তাকে মিথ্যা কথা বলে ফরিদগঞ্জের ভাটিয়ালপুরে এনে ধর্ষণের পর শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে ডাকাতিয়া নদীর পারে ফেলে যায়।

তিনি যাদের হত্যা করেন, তারা সবাই ছিলেন পোশাকশ্রমিক। এর মধ্যে ফরিদগঞ্জে এনে ছয়টি, চাঁদপুর সদরে চারটি এবং হাইমচরে এক নারীকে হত্যা করেন রসু খাঁ। হত্যার শিকার নারীরা সবাই ছিলেন ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী।

রসু খাঁর সর্বশেষ অবস্থা

গাজীপুরের কাশিমপুরের হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মামুন চলতি বছরের শুরুতে গণমাধ্যমকে জানান, ফাঁসির আদেশ পাওয়া রসু খাঁকে (৫২) কিছুদিন আগে কুমিল্লার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের পাঠানো হয়। তিনি বর্তমানে রয়েছেন ফাঁসির সেলে।

রসু খাঁ সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন বলেও জানান ওই কর্মকর্তা। বলেন, যেহেতু বাইরের খাবার আনার নিয়ম নেই তাই রসু খাঁকে কারাগারের রান্না হওয়া খাবার খেতে হয়। তবে কোনো স্বজন এই কারাগারে রসু খাঁকে দেখতে এখনও আসেননি বলে জানান তিনি।

দেশে ধর্ষণের মামলার এমন বিচারহীনতার কারণ কী

দীর্ঘদিন ধরে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে গবেষণা করে আসছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. নুরজাহান খাতুন। তিনি চ্যানেল 24 অনলাইনকে জানান, দ্রুত শাস্তি বাস্তবায়ন না হওয়া এমন অপরাধ বারবার ঘটার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি যদি এমন অনুভব করে যে, এই অপরাধ করলে নিশ্চিত এবং দ্রুত শাস্তি তাকে পেতেই হবে, তাহলে তার অপরাধ প্রবণতা কমবে।

রসু খাঁর মতো অপরাধীর দেড় যুগেও বিচার না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনার মামলায় ভুক্তভোগীর শেষ পর্যন্ত বিচার পাওয়ার হার অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে ঘটনা ধামাচাপাও দেয়া হয়।

তিনি বলেন, ধর্ষণের মতো ঘটনাকে অনেকে বিকৃত বা অসুস্থ মানসিকতার কারণ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। এগুলো এক ধরনের জাস্টিফিকেশন দিয়ে দেয় যে, যারা এ ধরনের অপরাধ করছে তারা অসুস্থ বা বিকৃত। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বিষয়টা এরকম না। এ ধরনের ন্যারেটিভগুলোও ধর্ষণকারীদের কিছুটা হলেও পার পাইয়ে দেয়।

বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রিতা ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারকে আরও বেশি দুর্বল ও হুমকির মধ্যে ফেলে দেয় বলেও জানান এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ। আর এই বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতার জন্য বেশ কিছু বিষয়কে দায়ী করেন তিনি। বলেন, বড় সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ঘাটতি এবং ঘটনা ঘটার পর তথ্য উপস্থাপনে মিডিয়ার যত সক্রিয়তা থাকে, পরে বিচার চলাকালীন সময়ে সেই ভূমিকা কমে যাওয়ায় ঘটনার গুরুত্ব কমে যায়। শেষ পর্যন্ত সকল জায়গা থেকে প্রতিক্রিয়া আসলে রাষ্ট্র বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে বাধ্য হবে বলে মত তার।

Link copied!