প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২৬, ০৩:২১ এএম
9
মঙ্গলবার ১৯, মে ২০২৬ -- : -- --
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার আর্কাডিয়া শহরের মেয়র আইলিন ওয়াং পদত্যাগের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে স্থানীয় পর্যায়ে চীনের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারে বেইজিংয়ের এমন প্রচেষ্টা নতুন কিছু নয়।
৫৮ বছর বয়সী ওয়াং সোমবার একটি ফৌজদারি অভিযোগে দোষ স্বীকারে সম্মত হন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি চীনের পক্ষে অবৈধ বিদেশি এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নথিতে বলা হয়, ওয়াং ও তার এক সহযোগী চীনের স্বার্থে কাজ করেন এবং স্থানীয় চীনা-আমেরিকান সম্প্রদায়ের সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচিত একটি ওয়েবসাইটে বেইজিংপন্থি প্রচারণা চালান।
এই ঘটনায় আলোড়ন তৈরি হয়েছে আর্কাডিয়ায়, যেটিকে বড় ও সচ্ছল চীনা-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর কারণে অনেক সময় ‘চাইনিজ বেভারলি হিলস’ বলা হয়। প্রায় ৫৬ হাজার বাসিন্দার এ শহরের অর্ধেকের মতো চীনা বংশোদ্ভূত।
২০২২ সালে সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দায়িত্ব পালন করছিলেন ওয়াং। আর্কাডিয়ায় কাউন্সিল সদস্যদের ঘুরিয়ে মেয়রের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পদত্যাগের সময় তিনি মেয়র ছিলেন।
শহর কর্তৃপক্ষ অভিযোগকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে তারা বলেছে, একজনের কর্মকাণ্ড দিয়ে পুরো সম্প্রদায়কে বিচার করা উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো জোশুয়া কারলান্টজিক বলেন, বিদেশে প্রভাব বিস্তারে চীনের কর্মকাণ্ড এখন ‘খুবই সাধারণ’ হয়ে উঠেছে।
তার ভাষ্য, চীনের একটি বিশেষ সংস্থা রয়েছে, যারা প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে বিদেশি সরকার ও সমাজে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়। এর লক্ষ্য হলো জনমত নিয়ন্ত্রণ, ভিন্নমত কমানো এবং রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করা।
তিনি বলেন, ‘চীন স্থানীয় থেকে জাতীয়—সব পর্যায়ের রাজনীতিক, গণমাধ্যম ও ছাত্রগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। এ জন্য তাদের বড় ধরনের প্রচেষ্টা রয়েছে।’
কারলান্টজিকের মতে, মেয়র ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিকদের লক্ষ্যবস্তু করার কারণ হলো—তাদের অনেকের আন্তর্জাতিক বিষয়ক অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা কাঠামো তুলনামূলক দুর্বল।
তবে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ওয়াংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে তিনি সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়ার আগেই।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, বিদেশি সরকারের পক্ষে কাজ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিবন্ধন করতে হয়। ওয়াংয়ের বিরুদ্ধে এমন নিবন্ধন না করার অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানাও হতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের আইন বিশেষজ্ঞ রোজ চ্যান লুই বলেন, বিদেশি সরকারের পক্ষে জনমত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কাজ করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের আইনের আওতায় পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘আপনি যদি জানেন যে আপনার কর্মকাণ্ড কোনো বিদেশি সত্তা সম্পর্কে জনমত প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে আইন আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।’
জার্মান মার্শাল ফান্ডের ইন্দো-প্যাসিফিক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ফেলো মারেইকে ওলবার্গ বলেন, বিদেশিদের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার কৌশল চীনের দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও সংগঠিত ও পরিশীলিত হয়েছে।
তার মতে, চীন মনে করে ‘বিরূপ বয়ান মোকাবিলা’ করতে হবে এবং এমন কোনো পরিসর রাখা যাবে না, যা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বিচার বিভাগের অভিযোগে উল্লেখ করা এক লেখায় শিনজিয়াংয়ে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বা ‘গণহত্যা’ হয়নি বলে দাবি করা হয়েছিল। এটি উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনের দমন-পীড়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোর পাল্টা বয়ান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উইঘুর-আমেরিকান অধিকারকর্মী রুশান আব্বাস বলেন, এই ঘটনা দেখাচ্ছে যে চীন বিশ্বজুড়ে ভিন্নমত দমন ও জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এটি উদ্বেগজনক, তবে বিস্ময়কর নয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বৈশ্বিক পর্যায়ে বিস্তৃত।’
এদিকে আর্কাডিয়া সিটি কাউন্সিলের সদস্য শ্যারন কোয়ান বলেন, গত এক বছর ধরে তিনি স্বচ্ছতা ও বিদেশি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। তার দাবি, কাউন্সিল পরিস্থিতির গুরুত্ব যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।
অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র পল চেং বলেন, গুজব বা অনুমানের ভিত্তিতে তদন্ত চালানো বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তিনি রাজনৈতিক বিতর্কে না জড়িয়ে শহর প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
ওয়াংয়ের আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে বলেন, ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ঘটনার কারণে তিনি ‘ভুল পথে পরিচালিত’ হয়েছেন। তারা জানান, ওয়াং অভিযোগের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন এবং নিজের ভুলের দায় নিতে প্রস্তুত।
আর্কাডিয়ার সিটি ম্যানেজার ডমিনিক লাজারেত্তো বলেন, প্রাথমিক পর্যালোচনায় শহরের অর্থ, কর্মী বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ওয়াংয়ের কর্মকাণ্ডের কোনো প্রভাব পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনে ফেডারেল কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
আগামী ২৯ মে ওয়াংয়ের আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে।