আ.লীগ চায় রাখতে, বিএনপি ফিরতে

0
18

লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসন বিএনপির হাতছাড়া হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে এ আসনে নৌকার পতাকা ওড়ান এ কে এম শাহজাহান কামাল। গত জানুয়ারিতে তিনি পান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর দায়িত্ব। এখন দলটি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মাথাব্যথার কারণ তিনি। আসনটিতে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলটিতে নতুন মেরুকরণ দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচনে আসনটি ধরে রাখা হবে তাদের জন্য অনেকটা চ্যালেঞ্জের মতো।খবর যুগান্তরের।

বিএনপি চাইছে, তাদের হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে উঠেছে দলটির ভেতরে বড় ধরনের অনৈক্য। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিসহ দলীয় নানা কর্মসূচিতেও নেতা–কর্মীরা এক হতে পারেননি। জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল খায়ের ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবুকে ঘিরে দলে বিভক্তি দীর্ঘদিনের।

আওয়ামী লীগের অবস্থা
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও আইনজীবী (সাবেক পিপি) নুরুল ইসলামকে লক্ষ্মীপুর শহরের বাসা থেকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সারা দেশে আলোচিত হয়ে ওঠে এই জেলা। সন্ত্রাস আর খুনোখুনির জনপদ হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুর এখন অনেকটাই শান্ত। দশম সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর–৩ আসনে সাংসদ নির্বাচিত হলেও এ কে এম শাহজাহান কামাল আওয়ামী লীগে বিশেষ কোনো অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। দল চলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু, সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন চৌধুরী ও লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র আবু তাহেরকে ঘিরে।

লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক চারজন নেতা বলেন, ছাত্রলীগ থেকে রাজনীতি করে উঠে এসেছেন তাঁরা। বিরোধী দলে থাকার সময় মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন অনেক। কিন্তু সুসময়ে দলে তাঁদের স্থান হয়নি।

নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২ জানুয়ারি সাংসদ শাহজাহান কামাল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী হওয়ার পর দলের কিছু নেতা-কর্মী তাঁর দিকে ঝুঁকেছেন। এ সুযোগে এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন মন্ত্রী। কিন্তু তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এলাকায় বেশ তৎপর রয়েছেন গোলাম ফারুক। আগামী নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগ্রহ থেকে এলাকাবাসীর সাহায্য–সহযোগিতায় হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। শেষ সময়ে এসে আবু তাহের ও তাঁর ছেলে জেলা যুবলীগের সভাপতি এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপু মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। সালাহ উদ্দিন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। দলীয় মনোনয়ন ফরম নেওয়ার পর থেকে বাবা-ছেলের দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা ফেসবুকে ভোটারদের সমর্থন চেয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। আসনে নৌকার মাঝি হওয়ার আশায় নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন সজিব গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাসেম, ঢাকার মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সাত্তার, লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এম আলাউদ্দিনসহ আরও ১৬ জন। তাঁরাও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

মনোনয়ন পেতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুকের চেষ্টা চোখে পড়ার মতো। ইউনিয়ন পর্যায়ে সভা-সমাবেশ করছেন নিয়মিত। দলের একটি বড় অংশও তাঁর সঙ্গে রয়েছে।

মন্ত্রী শাহজাহান কামালও মনোনয়ন পেতে কম তৎপর নন। এলাকায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি প্রচার–প্রচারণায় যুক্ত রয়েছেন তিনি। প্রথম আলোর কাছে তিনি দাবি করেন, আগামী নির্বাচনে তাঁর মনোনয়ন পাওয়া নিশ্চিত। কেননা, অন্য যাঁরা প্রার্থী হতে চাইছেন, তাঁদের কেউ জনপ্রিয়তায় তাঁর ধারেকাছে নেই।

বিএনপির অবস্থা

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল—চারটি নির্বাচনেই এ আসনে টানা জয় পেয়েছে বিএনপি। দলটির সাংসদদের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জয়ী হন ২০০১ ও ২০০৮ সালে। এর আগের দুই মেয়াদে ছিলেন খায়রুল এনাম।

লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির রাজনীতি আবর্তিত হয় সাবেক সাংসদ আবুল খায়ের ভূঁইয়া ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবু—এ তিন পক্ষ ঘিরে। তবে সাহাবুদ্দিনকে ঠেকাতে এক বছর আগে সাবেক দুই সাংসদ জোট বাঁধেন। এখন দলের প্রতিটি কর্মসূচি দুই পক্ষে আলাদাভাবে পালন করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মজবুত অবস্থান তৈরি করতে পারছে না জেলা বিএনপি।

দলের পাঁচজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাহাবুদ্দিন সাবুর বাসায় ঢুকে তাঁর পায়ে গুলি করেন। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে আবার আন্দোলন–সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন তিনি। এতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সুনজর পড়ে তাঁর ওপর। পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসমাজকল্যাণ সম্পাদক হন তিনি। সুনজর কাজে লাগিয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজের নাম ঘোষণা করেন। এতে নড়েচড়ে বসেন আবুল খায়ের ভূঁইয়া ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী। তাঁকে ঠেকাতে এককাট্টা হন তাঁরা। সাবুও এবার দল থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী।

সাহাবুদ্দিন সাবু বলেন, ‘নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে আমি একটা অবস্থান তৈরি করেছি। আশা করছি, দল আমাকে মনোনয়ন দেবে। হত্যার উদ্দেশ্যে আমাকে গুলি করা হয়। তবুও আমি পিছু হটিনি।’

এদিকে দুই মেয়াদে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী নিজের নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন বলে এলাকাবাসীর দাবি। দলের একটি অংশও তাঁর পক্ষে। নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর রাখছেন তিনি। এলাকায় এসে বিভিন্ন কর্মসূচিতেও যোগ দিচ্ছেন।

শহীদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দলে কোনো বিভক্ত নেই। বিএনপি একটি বড় দল। এখানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবেই। আগামী নির্বাচনে এই আসন পুনরুদ্ধার করতে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আবারও তাঁর ওপর আস্থা রাখবেন বলে আশাবাদী তিনি। প্রায় এক বছর ধরে দলীয় কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুষ্টিমেয় কয়েকজন নেতা কোন্দলে জড়িত। তাঁদের পাশে কেউ নেই।

LEAVE A REPLY