তাকে আমি চিঠি লিখিনি

0
81

ডাকবাক্সের এই ভীষণ দুর্দিনে চিঠির প্রসঙ্গে মনের আড়ালে থেকে যাওয়া অন্য এক চিঠির বাক্স ফিরে এলো ধুঁকতে ধুঁকতে। না- লেখা চিঠি জমিয়ে রাখার বাক্সটা বহুদিনের পুরনো। খোঁজ করে দেখা গেল, তাতে বাসিন্দার সংখ্যাও প্রায় তলানিতে। তাহলে তো সব কথা চিঠি অথবা উড়ো চিঠি হয়ে পৌঁছে গেছে প্রাপকের ঠিকানায়। প্রেরকের চিঠির বাক্সে পড়ে আছে একটি চিঠি। নাক টানলে সেই চিঠির ভাঁজ থেকে পাওয়া যাবে হয়তো পাউডারের সুগন্ধ অথবা ঝুর ঝুর করে খসে পড়বে গোলাপ ফুলের পাপড়ি। আর এত এত বছর পরে ঝরেপড়া ফুলের পাপড়ির সঙ্গে হয়তো চিঠির শব্দগুলোও খসে পড়েছে আবেদন হারিয়ে। কিন্তু খসে পড়ূক আর যাই হোক, চিঠি তো একটা আছেই। যে চিঠি সত্যি সত্যি লিখিনি আমি। খবর সমকাল ।

ঠিক সন-তারিখ মিলিয়ে কবে সে চিঠি লেখা শুরু হয়েছিল মনে নেই এখন। তখন সদ্য গুছিয়ে লিখে কিছু একটা দাঁড় করানোর অভ্যাসটা গড়ে উঠছে। ওই সময়েই তাকে ভালো লেগে গিয়েছিল। একই পাড়ায় বাস ছিল আমাদের। বয়সে বড় এক নারী। অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন সেই মহিলা। আকর্ষণীয় মুখশ্রীর এক নারী। হয়তো সেই সৌন্দর্য আক্রমণ করেছিল আমার অনুভূতিকে। যেমন হয় কিশোর বয়সে।

আমাদের পাড়ায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকত সেই পরিবারটি। তার কোনো সন্তান ছিল না। তখন আমি স্কুলের শেষ ভাগের ছাত্র। ক্রিকেট-ফুটবল খেলি, বেপাড়ায় গিয়ে মারামারি করি, গলির মুখে আড্ডা দিই, সন্ধ্যা হলে পড়তে ভালো লাগে না। তাকে হঠাৎ হঠাৎ দেখি সেই দোতলা বাড়ির চওড়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে বিকেলবেলা। ভালো লেগে গিয়েছিল তাকে? হয়তো। সেই বয়সে ভালো লাগার সংজ্ঞাটাই তো ছিল আলাদা। বছর তিরিশ আগে বয়সের ব্যবধান আর প্রেমে পড়ার মাঝে সীমারেখাটা সবাই মেনে চলত। তাই মনের মধ্যে ফুল ফুটে ওঠে আবার মরে যায়। সেই পাড়ার গলি জানত আমার ভালোলাগা, জানত কোনো কোনো লোডশেডিংয়ের দীর্ঘ সন্ধ্যা, একা হয়ে থাকা মুদি দোকানের দরজা। আমার চেয়ে বয়সে বেশ অনেকটাই বড় ভদ্রমহিলাকে আমার ভালো লেগে গিয়েছিল।

এমনি এক সময়ে আমার প্রতিবেশী এক বড় ভাই প্রেমে পড়লেন তার। বেশ অনেকটাই পরকীয়া প্রেমের গন্ধ সেই কাহিনীতে। কিন্তু তখন তো প্রেমের এতসব রকমফেরের গলি জানা নেই। আসতে-যেতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা সেই নারীকে ভালো লাগে আমার। একদিন মনে হলো, চিঠি লিখে ফেলি একটা। যেরকম সবাই লেখে। প্রেমের চিঠি। জানাব, তাকে বারান্দায় না-দেখলে আমার কেন একা লাগে দুপুরবেলা। কয়েক লাইন লিখেছিলাম কি? মনে আছে, লেখা হয়েছিল কয়েক ছত্র মাত্র। তারপর ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া। আবার লেখা, আবার বাতিল করে দেওয়া। সেই এক গোপন অস্থিরতার সময়ে সেই প্রতিবেশী যুবকের সঙ্গে তার এক ধরনের সম্পর্কের কথাটা জেনে বেদনা বোধ করেছিলাম।

আমার সেই বড় ভাই ছিলেন একেবারে পাশের বাড়ির বাসিন্দা। এক বিকেলে হঠাৎ ডেকে নিয়ে গিয়ে পকেটে গুঁজে দিলেন একটা চিরকুট আর একটি টাকা। বললেন খামের ভেতরে যে চিঠিটা আছে সেটা পৌঁছে দিতে হবে সেই নারীর বাসার নিচতলার গেটে লাগানো ডাকবাক্সে। সঙ্গে একটি টাকা ঘুষ। আমি হতবাক। কিন্তু কিছু তো করার নেই। ডাকবাক্স আর চিঠি বিষয়টার তখনও এত অনটনকাল ছিল না। নিজের হৃদয়ের অনটন ভুলে সেদিন হেমন্তের পাতাঝরা অরণ্যের মনভাঙা ডাকপিয়ন আমি ঠিকঠাক চিঠি পৌঁছে দিলাম। আমার না-লেখা চিঠির গল্প শুরু হয়েছিল এই ঘটনার পর।

আমার চাকরি হয়ে গেল ডাকপিয়নের পদে। এক রাতে সেই বড় ভাই চিঠি দিয়ে গেল। পৌঁছে দিতে হবে পরদিন। নড়বড়ে মন নিয়ে বিছানায় বসে বহুক্ষণ আকাশ-পাতাল ভেবে খুললাম সেই চিঠি। নাকে ভেসে এলো পারফিউমের সুঘ্রাণ। সাদা পৃষ্ঠায় ছোট ছোট কালো অক্ষরে লেখা চিঠি। জানতাম অন্যের চিঠি পড়া অপরাধ। কিন্তু কৌতূহল আর বেদনার মাত্রা ছড়ানো বিস্তার পেছন ছাড়ল না। হঠাৎ কী মনে হলো, ঠিক করলাম এই চিঠির জায়গায় আমি নিজে চিঠি লিখব। সেখানে থাকবে আমার অপ্রকাশিত ভালোবাসার কথা। রাত জেগে শুরু হলো চিঠি লেখা। ছোট ছোট অক্ষরে আমার ভালোবাসার কথাগুলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল অঙ্ক খাতার পৃষ্ঠায়।

পরদিন একটু ভয়ে ভয়েই চিঠি পৌঁছে দিলাম। কোনো কারণে ধরা পড়ে গেলেই তো অনর্থ ঘটবে। কিন্তু পরদিন উত্তর আনতে গিয়ে বিপদের বার্তা পেলাম না। দেখা পেলাম তারও। দাঁড়িয়েছিলেন বারান্দায়। আমাকে যথাস্থানে চিঠি রাখতে দেখে হেসেছিলেন সামান্য। লেটারবক্সে পেলাম তার উত্তর লেখা চিঠি। চিঠি নিয়ে মুদি দোকানের ভেতরে ঢুকে খুলে পড়ি। এ তো আমাকেই লেখা উত্তর। আমার ভালোবাসার শব্দগুলোর জবাব লেখা। অদ্ভুত এক অনুভূতি!

এরপর রাত জেগে চিঠি লেখা আমার কাছে হয়ে উঠল নেশার মতোন। সেই বড় ভাই চিঠি দিয়ে যায় আর আমি সে চিঠি পাল্টে লিখে চলি আমার পৃথিবীর কাহিনী। সেসব চিঠিতে আকাশ, চাঁদ, দুঃখ, ভালোবাসা, আর না-পাওয়ার বেদনা ছড়িয়ে থাকত। আমি খুব সাবধানে আরেক মানুষের লেখার আড়ালে গুঁজে দিতাম আমার ভালো লাগার কথা। তার উত্তরগুলো আমার পড়ার সুযোগ হতো না কখনোই, তবে ভেবে নিতাম উল্টোপাল্টা কত কী।

চিঠি লিখতে লিখতে কোনো কোনো রাতে ভাবতাম, একদিন তাকে আমার কথাটা বলে ফেলব। ঠিক করে ফেলতাম পরদিন দেখা করে সব জানাব। বলে দেব আমি তাকে ভালোবাসি। তারপর আবার পিছিয়ে যেতাম। সে তো অসম্ভব এক সম্ভাবনা। কেমন অস্থির অস্থির লাগত সবকিছু। কখনও তাদের বাসার সামনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ছোট্ট মুদি দোকানে বসে সময় কাটাতাম। কোনোদিন দেখতাম ভদ্রমহিলা হেঁটে হেঁটে বাইরে যাচ্ছেন। আবার কোনোদিন রিকশায়। শাড়িতে তাকে ভীষণ মানাত। মজা হচ্ছে, ওই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে হাতের ইশারায় কথা বলত সেই বড় ভাইও।

লেখাটা লিখতে লিখতে ভেবেছি অনেক। প্রসঙ্গ তো না-লেখা চিঠির গল্প। কিন্তু আমি তো লিখেছিলাম সেই অপ্রকাশিত অধ্যায়ের চিঠিগুলো। আরেক মানুষের আড়ালে দাঁড়িয়ে লিখে দিয়েছিলাম নিজের কথা, ভালোবাসার অনুভূতি। কিন্তু সেই চিঠি কি সত্যি সত্যি আমি লিখেছিলাম? চিঠির তলায় অন্য এক মানুষের নাম। সম্ভাষণ অন্য, আবহ অন্য, প্রেমের প্রকাশও ভিন্ন। তাহলে তো চিঠি আমি লিখিনি। অন্য কারও ভালোবাসায় উড়ে বসা ভূমিকার মতো আমি। তাকে তো কোনোদিন আর জানানো হয়নি আমার কথা, বলা হয়নি সেই ছায়া পত্রলেখক আসলে আমি। পৃথিবীর মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সেই নারী। বড় ভাইয়ের সেই ভালোবাসার পর্বও খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ভাড়াটে বাড়ির মতো প্রেমও ঠিকানা বদলে চলে গিয়েছিল অন্য পাড়ায়। শুধু শূন্য বাড়িটার পাশ দিয়ে গেলে মন খারাপ হতো। রাত জেগে চিঠি না-লিখতে পারার কষ্টটা জ্বালাতো খুব।

এখন মনে হয়, আসলে ওই চিঠিগুলো আমার কাছে একটা না- লেখা পুরো অধ্যায় হয়ে জমে আছে গোপন বাক্সে। আমি তো তাকে চিঠি লিখিনি। লিখেছিল অন্য একজন। আমার শব্দগুলো শুধু সেখানে ঝরে পড়েছিল শীতের ভোরে শিউলি ফুলের মতোন।

LEAVE A REPLY