রোডসের সাক্ষাৎকার: বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে বলছেন নতুন কোচ

0
64

বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসে তিনিই প্রথম পেশাদার ইংলিশ কোচ। বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়েই তাঁর শুরুটা হলো ভয়াবহ! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম দিনে দেখলেন তাঁর দল প্রথম ইনিংসে অলআউট ৪৩, খেলতে পারেনি একটি সেশনও (অ্যান্টিগা টেস্ট)। সফরের শুরু যতটা ভয়ংকর, শেষের অংশ ততই মধুর। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট দুর্দান্তই হয়েছে স্টিভ রোডসের। ক্যারিবীয় সফরের আনন্দদায়ী স্মৃতি নিয়ে জাবর কাটার সময় নেই। খবর প্রথম আলো ।

সামনে চলে এসেছে এশিয়া কাপ। শুধু এশিয়া কাপই নয়, গত পরশু মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমের সামনে প্রথম আলোকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে রোডস বললেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক অনেক বিষয় নিয়েই—

* দায়িত্বের ‘প্রথম প্রহরে’ই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। অ্যান্টিগা টেস্টে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ৪৩ রানে অলআউটের ঘটনা যখন স্মৃতিতে ফিরে আসে, কেমন লাগে?

স্টিভ রোডস: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মনে হয় না আর কোনো কোচের প্রথম দিন এতটা খারাপ হয়েছে (হাসি)! আন্তর্জাতিক অভিষেকে আর কোনো কোচের এমন অভিজ্ঞতা হলে আমি অবাকই হব। দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে আছি। জানি, আপনার ভালো দিন আসবে, খারাপ দিনও আসবে, সে আপনি যে পর্যায়ে ক্রিকেটই খেলুন না কেন। ওটা ছিল আমাদের জন্য একটা খারাপ দিন। সত্যি বিশ্বাস করি, যদি আমরা টস জিততাম ওই দিন, আমাদের দিনটাই ভালো হতো। যদি টস জিততাম সিরিজে আমাদের অন্য রকম শুরু হতে পারত। প্রতিপক্ষকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। তারা কন্ডিশনকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে। তাদের কাজটা তারা যথার্থভাবে করেছে। সফরের পরের অংশে আমরা কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়েছি। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলে কিছু খেলোয়াড়ের যোগ হওয়াটা দলের চেহারাটাই বদলে দিয়েছে। নতুনভাবে শুরু করেছি ওয়ানডে সিরিজ। শেষমেশ সমাপ্তি হয়েছে দুর্দান্ত। দলীয় পারফরম্যান্স অসাধারণ হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আমার প্রথম সফরটা অসাধারণ এবং বিশেষ কিছু হয়ে থাকল।

* ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর নিয়ে অনেক হয়েছে। এবার এশিয়া কাপ প্রসঙ্গে আসি। এশিয়া কাপের বাংলাদেশ দল তৈরিতে কোন বিষয়টা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন?

রোডস: আমরা জানি ওয়ানডে ক্রিকেট কীভাবে খেলতে হয়। এটা ধরে রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। গুরুত্ব দিয়েছি আরও ভালো কীভাবে করা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলি, ২৮০ রানে সন্তুষ্ট থাকতে চাই না। ৩০০ রানের বেশি করতে চাই। শুরুতেই প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে চাই। বড় স্কোর গড়ায় অভ্যস্ত হওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্যাম্পে এক দিনের ম্যাচের অনেক প্রস্তুতি নিয়েছি, আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন। ফিল্ডিংয়ের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছি। একই সঙ্গে শট খেলা ও বোলিংয়ে কীভাবে আমাদের পরিকল্পনা কাজে লাগাব—এসব নিয়েও কাজ করেছি।

মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে আলাপচারিতায় রোডস। ছবি: শামসুল হকমুশফিকুর রহিমের সঙ্গে আলাপচারিতায় রোডস। ছবি: শামসুল হক* সাকিব আল হাসানের ফিটনেস নিয়ে অনেক বিতর্ক হচ্ছে। তাঁকে নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী? ফিটনেস নিয়ে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন?

রোডস: হ্যাঁ, গত কয়েক দিনে মুঠোফোনে ওর সঙ্গে অনেকবার খুদে বার্তা চালাচালি হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেও তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে। আপনারা জানেন তার অস্ত্রোপচার লাগবে। কিন্তু কখন করাবে, সেটিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মেডিকেল টিম ও বোর্ড সভাপতির সঙ্গে তার কিছু বৈঠকে আমি ছিলাম।

* তাঁকে পুরো টুর্নামেন্টে পেতে কতটা আশাবাদী?

রোডস: দেখুন তার আঙুলে একটা চোট আছে। যেটি নিয়ে ক্যারিবীয় সফরে সে ভালোভাবে খেলেছে। তার একটা অস্ত্রোপচার দরকার। বলতে পারি না সে পুরো ফিট কি না, তবে তাকে নিয়ে আমি আশাবাদী।

* বাংলাদেশ তো ওয়ানডে সংস্করণে খুব ভালো খেলে। এটা কি আপনাকে বিশেষ অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে এবার এশিয়া কাপে?

রোডস: অবশ্যই এটা আত্মবিশ্বাসী করছে। একটু আগেও এ নিয়ে এক সহকর্মীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। যারা ক্রিকেট সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে, ধারাভাষ্যকার, কোচ, সাবেক খেলোয়াড় সবাই বিশ্বাস করে ওয়ানডে সংস্করণে বাংলাদেশ সত্যি ভয়ংকর দল। শুধু এশিয়া কাপ কেন, বিশ্বকাপেও। এই সমীহ পাওয়াটা দারুণ ব্যাপার। নিজেদের দিনে আমরা শীর্ষ দলগুলোকেও হারাতে পারি। যদি আমরা নিজেদের সেরাটা দিতে পারি, আমরা অনেক ম্যাচ জিততে পারব। তবে কখনো কখনো প্রতিপক্ষ আমাদের চেয়ে বেশি ভালো খেললে জেতা কঠিন হয়ে যাবে। বিষয়টা হচ্ছে আমরা উন্নতি করছি র‌্যাঙ্কিংয়ে। যেটি ধরে রাখতে পারছি অনেক দিন।

শিষ্যদের নিয়ে এখন এশিয়া কাপের প্রস্তুতিতে মগ্ন এই ইংলিশ কোচ। ছবি: শামসুল হকশিষ্যদের নিয়ে এখন এশিয়া কাপের প্রস্তুতিতে মগ্ন এই ইংলিশ কোচ। ছবি: শামসুল হক* তীরে এসে তরি ডোবার অনেক উদাহরণ আছে বাংলাদেশের। আপনি তো এসেই একটা ম্যাচে দেখলেন, গায়ানায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে। শেষ মুহূর্তে স্নায়ুর চাপের সঙ্গে বাংলাদেশ কেন যেন পেরে ওঠে না। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে আপনার ভাবনাটা কী?

রোডস: আমার মনে হয় আমরা গত কিছুদিনে কিছুটা বদলেছি। ক্যারিবীয় সফরে যে ক্লোজ ম্যাচটা হেরেছি, সেটি অন্য রকম হতে পারত। দলকে শান্ত রাখা ও তাদের নির্ভার করাটা গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাশ (মাশরাফি বিন মুর্তজা) অনেক প্যাশনেট। দলকে সে নিজের মতো করে দারুণভাবে চালাতে পারে। দলে স্থিতিশীলতা আনতে পারে, যেটি ম্যাচের শেষ পর্যন্ত দলকে আত্মবিশ্বাসী করতে সহায়তা করে। ড্রেসিংরুমে কিংবা মাঠে তাকে পাওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সে সেরাটা বের করে আনতে পারে। তাদের বিশ্বাস করতে শেখায় যে ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াইয়ে তারা টিকে আছে। সাকিব, আরেক নেতা। মাঠে খুব শান্ত থাকে, ছেলেদের সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পারে। ওর নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজে যে দুটি টি-টোয়েন্টি জিতলাম, অসাধারণ।

* ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকে ফিরেই বলেছেন, আপনার কিছু লম্বা ফাস্ট বোলার দরকার। তা লম্বা পেসার খুঁজে পেতে কী উদ্যোগ নিলেন?

রোডস: আমার মনে হয় আমি এখানে আসার আগে হাথুরুসিংহে, কোর্টনি (ওয়ালশ) সবাই লম্বা ফাস্ট বোলার খুঁজেছে। এটা সহজ নয়। প্রাকৃতিকভাবে বাংলাদেশি বোলারদের যে উচ্চতা, সেটি মুহাম্মদ ইরফান বা জ্যাসন হোল্ডারের মতো হবে না। আমরা এটা মেনেই নিয়েছি, আমরা ওভাবে লম্বা বোলার পাব না। তবে এই ক্যাম্পে আপনি দুই-তিনজন বোলারকে দেখবেন—যেমন তাসকিন, শরিফুল ও খালেদ। শরিফুল ও খালেদ খুবই তরুণ, মাত্রই ক্যারিয়ার শুরু করেছে। এখনই ওদের ওপর চাপ দিতে চাই না।

* আগের কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের মতো আপনিও নির্বাচক কমিটির সদস্য। ২০১৬ সালে তৈরি জাতীয় দল নির্বাচনের এ ব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথাও হয়েছে। যা হোক, দল গঠনে আপনার নীতি কী হবে? আপনি কি মাঠে মাঠে গিয়ে খেলা দেখতে আগ্রহী?

রোডস: এটা বিসিবির সিদ্ধান্ত। আমি নির্বাচকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। নান্নু (মিনহাজুল আবেদীন) ও হাবিবুলের (বাশার) সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি এবং বিসিবি সভাপতিকে নিয়মিত জানাচ্ছি। আমার কাছে সিস্টেমটা বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয় সামনের বিপিএল হতে পারে দেশের ক্রিকেটারদের ভালোভাবে দেখার যথার্থ টুর্নামেন্ট। চাপের মধ্যে তারা কীভাবে খেলে, সেটি তখন বুঝতে পারব। আমি ক্রিকেট দেখতে ভালোবাসি। মাঠে গিয়ে খেলা দেখাটা আমার জন্য সমস্যা হবে না।

* খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলাবিষয়ক নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে গত কিছুদিনে; বিশেষ করে তরুণ খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ বেশি উঠছে। এটা নিয়ে আপনি কি ভীষণ উদ্বিগ্ন?

রোডস: না, আমি বুঝি পৃথিবীর একেক জায়গার সংস্কৃতি একেক রকম। আমার যেমন ইংল্যান্ড বা পশ্চিমা বিশ্বের সংস্কৃতি সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে। বোঝার চেষ্টা করছি এখানকার সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলাব্যবস্থা কেমন। আপনি যেটা বোঝাতে চাইছেন, সেটি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এখানে বিসিবির হয়ে কাজ করতে এসেছি। বিসিবিকে বলতে পারি না, বিসিবির এটা করা উচিত, ওটা করা উচিত। চেষ্টা করব সেরা ফল উপহার দিতে ও সেরা খেলোয়াড় তৈরি করতে যারা কিনা বাংলাদেশের হয়ে দুর্দান্ত খেলবে।

LEAVE A REPLY