চুক্তিতে বাস চলা বন্ধ হয়নি

0
165

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা, ডিএমপি কমিশনারের ঘোষণার পরও রাজধানীতে যত্রতত্র যাত্রী নামানো-ওঠানো বন্ধ হচ্ছে না। চলন্ত বাসে ঝুঁকি নিয়েই চলছে যাত্রী নামানো–ওঠানো। গতকাল দুপুরে মহাখালী এলাকায়। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

  • রাজধানীতে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা
  • সিদ্ধান্ত মানছেন না মালিকেরা
  • নির্ধারিত বেতন না থাকায় চালকেরা বেপরোয়া
  • মানা হচ্ছে না প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনাও

পরিবহন মালিক সমিতির নেওয়া সিদ্ধান্ত মানছেন না বাসমালিকেরা। প্রায় এক মাস আগে মালিক সমিতি চুক্তিতে বাস চালানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলেও তা কার্যকর হয়নি। রাজধানীর অধিকাংশ বাস এখনো চুক্তিতে বা ট্রিপ (এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত) ভিত্তিতে চলছে। নির্ধারিত বেতন না থাকায় চালক ও সহকারীরা বেশি যাত্রী ও ট্রিপের জন্য বেপরোয়া বাস চালানো বন্ধ করছেন না।  খবর প্রথম আলো

এদিকে সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১৭টি নির্দেশনা বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি নেই। গত ১৬ আগস্ট জারি করা এসব নির্দেশনা সম্পর্কে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাতটি নির্দেশনা ছিল দ্রুত কার্যকর করার মতো। চারটি নির্দেশনা চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। চারটি নির্দেশনা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। এ ছাড়া দুটি নির্দেশনা বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ও গতকাল বুধবার রাজধানীর আটটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দ্রুত কার্যকর করা যেত এমন সাতটি নির্দেশনার কোনোটিই সড়কে মানা হচ্ছে না। ওই নির্দেশনার অন্যতম যত্রতত্র বাসে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ হয়নি। গণপরিবহনে চালক ও সহকারীর ছবিসহ নাম, চালকের লাইসেন্স নম্বর এবং মোবাইল ফোন নম্বর প্রদর্শন করা হচ্ছে না। পদচারী-সেতু বা পাতালপথে প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। পদচারী-সেতুর ১০০ মিটারের মধ্যে রাস্তা পারাপার সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী দুজনের হেলমেট ব্যবহারের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পরিবহন খাতে মালিক সমিতি এবং শ্রমিক সমিতি যা চাচ্ছে তা-ই হচ্ছে। এসব সমিতির বিপক্ষে গিয়ে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার মতো সক্ষমতা এবং জনবল কোনোটাই সরকারি সংস্থাগুলোর নেই। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সাধারণ নাগরিকসহ সব পক্ষের সদিচ্ছা প্রয়োজন।

চুক্তিতে বাস চালানো বন্ধ হয়নি

পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনার বেশির ভাগ কারণ চুক্তিতে বাস চালানো। চুক্তিতে চললে চালকদের বেশি বেশি ট্রিপের তাড়া থাকে। জমার টাকা, সড়কে বিভিন্ন চাঁদা, জ্বালানি খরচ এবং অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর চালক ও তাঁর সহকারী নিজের আয় তোলেন। ফলে বেশি যাত্রী এবং ট্রিপের জন্য চালকেরা বেপরোয়া থাকেন। একই পথের অন্য পরিবহনের সঙ্গে বেশি রেষারেষি করেন।

গত ২৯ জুলাই বেপরোয়া বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। সেদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে মালিক সমিতি ঘোষণা দেয়, ৯ আগস্ট থেকে চুক্তিতে গাড়ি চালানো হবে না। ফিটনেসবিহীন গাড়িও না চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় তারা। কোনো মালিক চালকের সঙ্গে চুক্তিতে গাড়ি চালালে ওই কোম্পানির সমিতির সদস্যপদ বাতিল করা হবে।

বাস্তবে রাজধানীতে চুক্তিভিত্তিক বাস চালানো বন্ধ হয়নি। চুক্তির বদলে দৈনিক বেতনে বাস চালানোর ঘোষণাও বাস্তবায়িত হয়নি। কেরানীগঞ্জের কদমতলী থেকে মিরপুর চিড়িয়াখানা পথে চলাচলকারী দিশারী পরিবহন, গাবতলী-মতিঝিল চলাচলকারী গাবতলী লিংক পরিবহন, বাড্ডা নতুন বাজার-মিরপুর আনসার ক্যাম্প চলাচলকারী আকিক পরিবহন, আবদুল্লাহপুর থেকে মোহাম্মদপুর বছিলা পথে প্রজাপতি পরিবহন, নবীনগর থেকে মিরপুর ১৪ নম্বরে চলাচলকারী ইতিহাস পরিবহনের অন্তত ১০টি বাসের চালক ও সহকারীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা জানান, তাঁদের কারও বেতন নির্ধারিত নয়। মালিক সমিতির নির্দেশে বেতনভিত্তিক গাড়ি চলছে না। যত ট্রিপ তত টাকা—এই চুক্তিতে তাঁরা বাস চালাচ্ছেন।

মতিঝিল থেকে মিরপুর চিড়িয়াখানা পথে চলাচলকারী নিউ ভিশন পরিবহনের চালক আবদুর রব বলেন, ‘বেতন ঠিক করা থাকলে মাথায় চাপ কম থাকত। এখন ট্রিপ হিসেবে টাকা পাই। ট্রিপ কমে গেলে দিনের আয় কমে যায়। আবার যাত্রী কম তুললে মালিক রাতে হিসাব নেন। তাই বেশি ট্রিপ দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।’

তবে একজন পরিবহনমালিক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘হঠাৎ করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নিয়ম বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সমিতি। এই নির্দেশ মানতে হলে চালকদের নিয়োগপত্র, টিকিট কাউন্টার স্থাপনসহ বেশ কিছু কাজ করতে হবে। মালিক নির্ধারিত বেতন দিয়ে যাবেন, কিন্তু মালিকের আয় নিশ্চিত করবে কে?’

কোনো মালিক চালকদের সঙ্গে চুক্তিতে গাড়ি চালাচ্ছেন কি না তা দেখতে ঢাকার একাধিক জায়গায় পরিদর্শক দল বসাচ্ছে মালিক সমিতি। চুক্তিতে গাড়ি চালানোর অপরাধে ৯ আগস্ট পাঁচটি পরিবহন কোম্পানির সদস্যপদ বাতিল করে মালিক সমিতি। সদস্যপদ বাতিল করা পরিবহন কোম্পানিগুলো হচ্ছে আজমেরী পরিবহন, সুপ্রভাত পরিবহন, স্কাই লাইন পরিবহন, ডিএমকে পরিবহন ও গাবতলী-সদরঘাট (৭ নম্বর রোড) পরিবহন।

তবে সমিতির সদস্যপদ হারালেও এসব পরিবহনের বাসের নিবন্ধন বাতিল করা হয়নি। ফলে এসব বাস চালাতে কোনো বাধা নেই। গতকাল গাবতলী-সদরঘাট পরিবহন, আজমেরী পরিবহন, সুপ্রভাত পরিবহনের একাধিক বাস চলতে দেখা যায়।

জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার কোনো গাড়ি চুক্তিতে চলবে না। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ব্যবস্থা সাত দিনে হয়তো বন্ধ হবে না। মালিক সমিতি মাঠে আছে। দুই মাস সময় লাগলেও চুক্তিতে গাড়ি চালানো বন্ধ করা হবেই।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, গণপরিবহন চলার সময় দরজা বন্ধ রাখতে হবে এবং বাস থামবে নির্ধারিত স্থানে। কিন্তু গতকালও যত্রতত্র যাত্রী ওঠাতে-নামাতে দেখা গেছে। বেলা দেড়টার দিকে শ্যামলী এলাকায় গুলিস্তান থেকে মানিকগঞ্জ পথে চলাচলকারী শুভযাত্রা পরিবহন এবং গুলিস্তান থেকে ধামরাই পথে চলাচলকারী ডি লিংক পরিবহনের আরেকটি বাসকে আড়াআড়ি থামিয়ে যাত্রী তুলতে দেখা যায়।

গণপরিবহনে দৃশ্যমান দুটি জায়গায় চালক ও চালকের সহকারীর ছবিসহ নাম, চালকের লাইসেন্স নম্বর এবং মোবাইল ফোন নম্বর প্রদর্শনের কথা রয়েছে। কিন্তু গত দুই দিনে অন্তত ২৫টি বাসে দেখা যায়, কোনোটিরই চালকের ছবিসহ লাইসেন্স, মোবাইল ফোন নম্বর দৃশ্যমান জায়গায় প্রদর্শন করা হয়নি।

মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীকে (সর্বোচ্চ দুজন আরোহী) বাধ্যতামূলক হেলমেট পরা এবং সিগন্যালসহ ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করার নির্দেশনা ছিল। মোটরসাইকেলের চালকদের হেলমেট দেখা গেলেও অনেক আরোহীর হেলমেট ছিল না। গতকাল বিজয় সরণির পশ্চিম প্রান্তে উড়োজাহাজ ক্রসিংয়ে দেখা যায়, ট্রাফিক সদস্য খামারবাড়ি থেকে আসা যানবাহন থামিয়ে ক্রিসেন্ট রোড ধরে আসা যানবাহনকে চলার নির্দেশ দিচ্ছেন। এই কয়েক সেকেন্ডের সুযোগে বিজয় সরণির পূর্ব প্রান্ত থেকে আসা একাধিক মোটরসাইকেল ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে।

পদচারী-সেতু বা পাতালপথে পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আলোর ব্যবস্থা করা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পদচারী-সেতুর উভয় পাশের ১০০ মিটারের মধ্যে রাস্তা পারাপার বন্ধ এবং ফুটপাত হকারমুক্ত রাখার নির্দেশনা ছিল। গত দুই দিনে পাঁচটি পদচারী-সেতু ঘুরে দেখা যায়, এগুলো বেশ অপরিচ্ছন্ন, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে সড়ক ধরেই রাস্তা পার হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চারটি নির্দেশনা দীর্ঘমেয়াদি। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকায় দূরনিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় সংকেত পদ্ধতি চালু, ফিটনেসবিহীন যানবাহন দ্রুত ধ্বংস করার সম্ভাব্যতা যাচাই, লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি বা শুরুর সময় ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের সদস্যদের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের উদ্যোগ নেওয়া।

এর বাইরে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সংকেত ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে পদক্ষেপ এবং ৩০ অক্টোবরের মধ্যে ঢাকার সব সড়কের বিভাজকের উচ্চতা বাড়িয়ে বা স্থানের ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সড়কের নৈরাজ্য বন্ধে সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। নাগরিকদের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতাও প্রবল। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে হলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে।

LEAVE A REPLY