দেশেই অ্যান্টিভেনম, ৫ সাপ নিয়ে বিষ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু

0
107

পাঁচটি বিষধর সাপ নিয়ে শুরু হয়েছে সাপের কামড়ের ওষুধ অ্যান্টিভেনম তৈরির প্রথম পর্যায়ের কাজ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিকভাবে পাঁচটি সাপকে লালন-পালন করা হচ্ছে। এ সাপগুলোর বৃদ্ধি, সুস্থতাসহ অন্যান্য বিষয় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিষ বা ভেনম সংগ্রহের উপযোগী হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন গবেষকেরা। আট কোটি টাকা ব্যয়ে দেশে প্রথমবারের মতো অ্যান্টিভেনম তৈরির লক্ষ্যে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।  খবর প্রথম আলো

আমাদের দেশে প্রতিবছরই অনেক মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়। এ ব্যাপারে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হলেও বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে সাপের কামড়ে বছরে মারা যায় ৬ হাজার ৪১ জন। সাপ কামড়ানোর পর ৮৬ শতাংশ মানুষ ওঝার কাছে যায়। চিকিৎসকের কাছে যায় মাত্র ৩ শতাংশ। দেশে সাপের কামড়ের চিকিৎসায় এখন যেসব অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়, তা ভারত থেকে আসে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষামূলক অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য ভেনম সংগ্রহে ১০০টি সাপ নিয়ে গবেষণা করার প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো ২০টি কমন ক্রেইট বা কেউটে (bungaruscaeruleus), ২০টি ওয়ালস ক্রেইট (bungaruswalli), ১০টি গ্রেটার ব্ল্যাক ক্রেইট (bungarus niger), ৫টি ব্র্যান্ডেড ক্রেইট (bungarus fasciatus), ৫টি লেসার ব্ল্যাক ক্রেইট (bungaruslividus), ২০টি মনোক্লেড কোবরা (najakaouthia) ও ২০টি স্পেকটেকলড কোবরা বা চশমা গোখরো (najanaja)। এখন পর্যন্ত পাঁচটি সাপ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে বিষ বা ভেনম সংগ্রহ এখনো শুরু হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আর্থিক সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদি অ্যান্টিভেনম তৈরির প্রকল্পটিতে যুক্ত রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং জার্মানির গ্যোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা। জার্মানি থেকে জীববিজ্ঞানীরা এসে নিজেকে নিরাপদ রেখে বিষধর সাপ ধরা ও সাপগুলোকে খাইয়ে সুস্থ অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুসারে, সাপের কামড়ের রোগীর চিকিৎসার জন্য স্থানীয় সাপ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরি হলে তা সবচেয়ে কার্যকর হয়। কারণ, একেক দেশের সাপের প্রকৃতি একেক রকম। ভারতে যেসব সাপ থেকে ভেনম সংগ্রহ করা হয়, সেগুলোর ২০ শতাংশ মাত্র বাংলাদেশের সাপের সঙ্গে মেলে। অথচ বছরের পর বছর ধরে ভারতের অ্যান্টিভেনম দিয়েই বাংলাদেশের সাপের কামড়ের রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

তিনভাবে সাপের বিষ শরীরে প্রভাব ফেলে। হেমোটক্সিন হয় বা রক্তকে দূষিত করে, মায়োটক্সিন বা মাংসপেশিকে অকার্যকর করে দেয় এবং নিউরোটক্সিন অর্থাৎ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নন-কমিউনেকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মো. রাজীব আল-আমিন প্রথম আলোকে জানান, পরীক্ষামূলকভাবে অ্যান্টিভেনম তৈরির লক্ষ্যে পাঁচ বছরের এই প্রকল্পের জন্য আট কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। গত বছরের জুলাই মাস থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। সাপ সংগ্রহসহ অন্যান্য কাজে ইতিমধ্যে ৯৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনি বলেন, সাপের কামড়ের বিষয়টিকে দেশে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য হিসেবে ধরা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বছরে ছয় হাজার অ্যান্টিভেনম ডব্লিউএইচওর কাছ থেকে পেয়ে থাকে। সিভিল সার্জনের কাছ থেকে চাহিদা পাওয়ার ভিত্তিতে জেলা সদরে অ্যান্টভেনম সরবরাহ করা হয়। সাপ কামড়ানোর পর একেকজন রোগীকে ১০টি করে অ্যান্টিভেনম দিতে হয়।

সূত্রমতে, চাহিদার তুলনায় সরকারিভাবে অ্যান্টিভেনমের সরবরাহ অপ্রতুল। সরকারি হাসপাতালে অনেক রোগী বিনা মূল্যে তা পান না। তাঁদের হাসপাতালের বাইরে থেকে চড়া দামে কিনে নিতে হয়।

গাজীপুরে সদর উপজেলার পুবাইল ইউনিয়নের খোরাইদ গ্রামের বাসিন্দা মো. খোকন (৪৫) গত ২৭ মে গোখরো সাপের কামড় খেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। প্রথম আলোকে তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে তাঁকে অ্যান্টিভেনম বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা অথচ তাঁকে ১০টি ইনজেকশন ১১ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে।

LEAVE A REPLY