নির্বাচন হবেই ঠেকানোর শক্তি কারও নেই

0
143

আগামী জাতীয় নির্বাচন যথাসময়ে হবেই- এমন দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, নির্বাচন ইনশাআল্লাহ হবে। জনগণ সঙ্গে থাকলে কেউ ঠেকাতে পারবে না। এ নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারও নেই। যারা ঠেকাতে চেয়েছিল, আগেরবার তাদের মোকাবেলা করেছিল জনগণ, এবারও করবে। খবর সমকাল

নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার ছেলের মৃত্যুর পর সান্ত্বনা দিতে গেলে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমারও আত্মসম্মানবোধ আছে। এখন যে যা-ই বলুন না কেন, ক্ষমতায় থাকি বা না থাকি, আমি অন্তত তাদের সঙ্গে বসব না।

বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য সরকারের কোনো উদ্যোগ কিংবা বাধা কোনোটাই থাকবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সেটি তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। তারা এলে আসবে, না এলে নাই। আর এখানে তো সরকারের বাধা দেওয়া কিংবা দাওয়াত দেওয়ারও কিছু নেই। আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতির ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা ও এতে বিএনপির বিরোধিতা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেছেন, ইভিএমে বিএনপির আপত্তি কোথায়? ইভিএম হলে নির্বাচনে কারচুপি করতে পারবে না বলেই তারা এর বিরোধিতা করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ঘোষণা তার সরকারের ছিল। নির্বাচন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ইভিএমের ব্যবহার এরই একটি অংশ। এটি একটি নতুন প্রযুক্তি। তবে তাড়াহুড়া করে এটাকে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সীমিত পরিসরে হলেও আধুনিক বিশ্বের সর্বাধুনিক ভোট গ্রহণের এ প্রযুক্তি শুরু করা উচিত। তবে কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেখানে এটি বাতিল করে দেওয়া যাবে।

গতকাল রোববার তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন শেখ হাসিনা। তবে সেখানে বরাবরের মতো এবারও চলমান রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ই প্রাধান্য পেয়েছে। যুক্তফ্রন্ট নেতাদের নিয়েও সরস মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

আগামী একশ’ বছরের জন্য ‘ডেল্টা প্ল্যান’ ঘোষণার সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১০০ সালে বাংলাদেশকে কীভাবে দেখতে চাই, এই বদ্বীপকে বাঁচিয়ে রাখা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ অন্যান্য অভিঘাত থেকে বাঁচাতে এ পরিকল্পনা। দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতেই ডেল্টা প্ল্যান- ২১০০ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে কাজ চলছে। মঙ্গলবার একনেকের বৈঠকে আলোচনাসহ আওয়ামী লীগের আগামী নির্বাচনের ইশতেহারে এটি অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আরও ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে :শনিবার দলের এক জনসভায় বিএনপি নেতারা কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া আগামী নির্বাচনে যাবেন না এবং বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন হবেও না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়াকে তিনি গ্রেফতার করেননি। রাজনৈতিকভাবেও তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। খালেদা জিয়া গ্রেফতার হয়েছেন এতিমের টাকা চুরি করে, দুর্নীতির মামলায় আদালতের রায়ে। এখন তার মুক্তি আদালতের মাধ্যমেই হতে হবে। দ্রুত মুক্তি চাইলে রাষ্ট্রপতির কাছে অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে হবে।

নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসার জন্য বিভিন্ন মহলের তাগিদ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি থেকেও দাবি জানানো হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চেয়েছিলাম। ফোনও করেছিলাম। আপনারা জানেন, ফোন ধরেননি (খালেদা জিয়া)। তারপর খালেদা জিয়ার ছেলে মারা যাওয়ার পর আমি গেলাম। আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে আমাকে ঢুকতে দিল না। সেদিন থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর ওদের সঙ্গে আমি অন্তত বসব না। আর কোনো আলোচনা হবে না। প্রশ্নই ওঠে না। আপনারা যে যা-ই বলেন, ক্ষমতাই থাকি বা না থাকি, আমার কিছু আসে যায় না।’

তিনি বলেন, ‘আমারও তো আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। যারা দিনের পর দিন আমার বাড়িতে এসে পড়ে থেকেছে- তারাই মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। কত বড় সাহস দেখিয়েছে! সেদিনই তো তাকে (খালেদা জিয়া) গ্রেফতার করতে পারতাম। যখন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারল, তখনও তো গ্রেফতার করা উচিত ছিল। আমি তো করিনি, তখন আমি সহনশীলতা দেখিয়েছি।’

যুক্তফ্রন্ট নেতাদের নিয়ে সরস মন্তব্য :সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা যুক্তফ্রন্ট নেতাদের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন যদি খুব গরম বক্তৃতা দেন, এখন থেকে সব কাজ বন্ধ। তাহলে ধরে নেবেন, ওনার প্লেন রেডি। আর বাক্সটা গাড়িতে। আমাদের সঙ্গে তো ছিলেন। আমরা দেখেছি।’

দশম সংসদ নির্বাচনে ১৫৩ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সমালোচনাকারী কামাল হোসেন নিজেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে সে তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার ছেড়ে দেওয়া সিটে উনি পেপার সাবমিট করলেন। আর কেউ করল না। উনি আনকনটেস্টেড জিতে আসলেন। এই আনকনটেস্টেড এমপি তো নিজেকে সংবিধানপ্রণেতা বলেন! এখন তো দেখি সেই সংবিধানও মানতে চান না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ড. কামাল বলেছেন, আদৌ নির্বাচন হবে না। তার মানে তারা বসেই আছেন। উত্তরপাড়ার দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে পারেন। আমাদের দেশে তো অনেকেই আছে, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাদের পছন্দ নয়। একটি অসাংবিধানিক সরকার এলে তারা পতাকা পাবেন, সুযোগ-সুবিধা পাবেন। সেদিকেই তো তারা চেয়ে থাকেন।

যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) নেতা আ স ম আবদুর রবের বিষয়ে শেখ হাসিনা হাসতে হাসতে বলেন, ‘রব সাহেব একসময় ছাত্রলীগ করত। তারপর ছাত্রলীগ ছেড়ে চলে গেল। আমরা ঠাট্টা করে বলতাম, অসময়ে নীরব, সুসময়ে সরব, আ স ম আবদুর রব। উনি এখন সরব হচ্ছেন; খুব ভালো কথা।’

কামাল হোসেন ও বি চৌধুরীদের রাজনৈতিক মিত্র কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনিও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। ছিয়ানব্বই সালের পার্লামেন্টে হঠাৎ কে কী তার মাথায় ঢোকাল, জানি না। তিনি রিজাইন করে স্বতন্ত্র ইলেকশন করে আসবেন, আওয়ামী লীগের এমপিরা তারে ভোট দেবেন, বিএনপির এমপিরা তারে ভোট দেবেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন। এই মাকাল ফলটা তাকে কে দেখাল, আমরা জানি না। তিনি নৌকাহারা ইলেকশনে জিতে আসতে পারলেন না।’

জাসদ থেকে আওয়ামী লীগ হয়ে এখন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনিও আমাদের পার্টি করতে এসেছিলেন। উনি এখানে খুব একটা স্বস্তি বোধ করে নাই। কারণ তাকে বললাম, আপনার লেখার হাত অনেক ভালো। আপনি তো সব সময় আমাদের বিরুদ্ধে লিখেন। এবার একটু আমাদের পক্ষে লিখেন। দেখা গেছে, উনি পক্ষে লিখতেই পারেন না। পক্ষে লিখতে বললেই মান্না জুড়ে দেয় কান্না।’

সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাবার আওয়ামী লীগ করার বিষয়টি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর তাকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘আপনার ডাক্তার’ নামে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক একটি অনুষ্ঠান করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, যে অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয় হয়।

এরপর বিএনপিতে যোগ দিয়ে মহাসচিব হওয়ার পর খালেদা জিয়ার আমলে রাষ্ট্রপতি হলেও টিকতে পারেননি বি চৌধুরী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালেদা জিয়াও ওনাকে সম্মান দেননি। ওনাকে বঙ্গভবন থেকে বের করে রেললাইনের ওপর দিয়ে দৌড় দেওয়ালো। বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিকল্পধারা করেছিলেন। সেই বিকল্প এখন স্বকল্প হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, দেশে দুটি দল আছে। একটি আওয়ামী লীগ, আরেকটি আওয়ামী লীগবিরোধী। এখন আওয়ামী লীগবিরোধীদের তো একটা ঐক্য দরকার। ড. কামালরা সেটি করছেন, এটি ভালো।

‘মিয়ানমার জঘন্য কাজ করেছে’ :বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার ছবি দিয়ে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর প্রপাগান্ডামূলক একটি বই প্রকাশ বিষয়ে তিনি বলেন, তারা এভাবে ভুয়া ছবি দিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে জঘন্য কাজ করেছে। কিন্তু এটা তারা কার কাছ থেকে শিখল? আমাদের দেশেও তো হয়েছে। একেবারে কাবাঘরের সামনে ব্যানার ধরার ছবির মিথ্যাচারও আমরা দেখেছি। বিএনপি-জামায়াত বারবারই এমন অপপ্রচার করেছে। পরে এগুলো মানুষের কাছে ধরাও পড়ে যায়। মিয়ানমার সরকারও ধরা পড়ে গেছে।

‘মৃত্যুভয়ে ভীত নই’ :প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশের মানুষ এখন জানে, একটা গণতান্ত্রিক সরকার থাকলে দেশের উন্নতি হয়। এটা মানুষ খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। সেই সচেতনতাটাও আছে। তারপরও ষড়যন্ত্র আছে, ষড়যন্ত্র থাকবে। যারা আমার বাবাকেই (জাতির পিতা) খুন করতে পারে, আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করে সফল হয়নি। হয়তো একদিন সফল হতেও পারে। এটা আমি সব সময় জানি। আর এটা জেনেই আমি বাংলাদেশে এসেছি। এটা জেনেই আমি রাজনীতি করে যাচ্ছি। আর এটা জেনেই কিন্তু আজকের এই উন্নয়নটা করে যাচ্ছি।

দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়া-সংক্রান্ত আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার হাতে কোনো ম্যাজিক নেই। দেশের প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর কর্তব্যবোধ থেকেই দেশের জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এ সময় তিনি বলেন, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করব, দেশের উন্নতি করব- এটাই হচ্ছে ম্যাজিক, আর কিছু নয়। আমি শ্রম দিতে পারি আর দেশের মানুষের জন্য কী করলে ভালো হবে, সেটুকু জানি। বাবার (বঙ্গবন্ধু) কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছি। নিজের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েছি। সারাদেশ ঘুরে ঘুরে দেখেছি মানুষের মূল সমস্যাগুলো কী।

গণমাধ্যমগুলো তার প্রতি বৈরী আচরণ করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, যারা চুরি-ডাকাতি-খুনি-দুর্নীতিবাজ, তারাই যেন বেশি ফেভার পায়। আর আমাদের পান থেকে চুন খসলেই সবাই চেপে ধরে। যারা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, বাংলাদেশের স্বাধীনতাই চায়নি, সেই পাকিপ্রেমীদের বংশপরম্পরাই যেন সংক্রমিত হচ্ছে।

বিমসটেক সম্মেলন প্রসঙ্গে :বিমসটেক সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমসটেক সম্মেলনে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বলেছি, বাংলাদেশ বিমসটেকের মতো সহযোগিতামূলক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে কাজ করে যাবে।

গত বৃহস্পতিবার দু’দিনের সফরে নেপালে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন তিনি। এ ছাড়া বিমসটেকভুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। শুক্রবার দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী।

LEAVE A REPLY